আজ আমার বাসর রাত। রুমের ভিতরে এ বাড়ির নতুন বউ আমার অপেক্ষায় বসে আছে। আর আমি? বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। অনেক আগেই রুমে ঢুকেছি। কিন্তু বউয়ের কাছে যাই নি। কারণ বউ আমার কল্পনার মতো রূপসী কোন মেয়ে না৷ সে কালো। হ্যাঁ তাঁর গায়ের রঙ কালো। বিয়েতে একজন বন্ধু বান্ধবও বাদ যায় নি যারা আমাকে কথা শুনায় নি। রাগে দুঃখে কষ্টে গা'টা জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। মন চাচ্ছে ভিতরে ঢুকে গলা চেপে মেয়েটাকে মেরে ফেলি। আমার মতো হ্যান্ডসাম গুড লুকিং ইঞ্জিনিয়ার ছেলের সাথে একটা কালো মেয়ে! এটা বেমানান। একদমই বেমানান। কোন ভাবেই যায় না। তাহলে কেন এই বিয়েটা করলাম?
ওই সেই একই কারণ। বাবা-মার মেয়েটাকে পছন্দ হয়েছে তাই আমার উপর জোর খাটিয়ে বিয়েটা দিয়েছে। বাবা-মার বয়স হয়েছে তাদের সাথে যে বেয়াদবি করবো তাও সম্ভব না। কারণ সে শিক্ষা আমাকে কখনোই তারা দেয় নি৷ আবার মেনে নিতেও পারছি না মেয়েটাকে।
ইচ্ছা ছিল একটা সুন্দরী রূপবতী মেয়েকে বিয়ে করবো। যাকে নিয়ে রাস্তায় বের হলে সব্বাই হা করে তাকিয়ে থাকবে৷ সব্বাই বলবে, ওই দেখ ইঞ্জিনিয়ার এর বউটা কত্তো সুন্দর। কিন্তু তা আর কিছুই হলো না। এখন সবাই বলবে, ওই দেখ কালি বউ নিয়া ঘুরে ইঞ্জিনিয়ার সাফাত। ছিঃ ভাবতেই ঘিন লাগছে৷
এদিকে সাফাতের স্ত্রী মৌরি একা একা ভিতরে রুমে বসে মন খারাপ করে ভাবছে,"নিশ্চিত ওনার আমাকে পছন্দ হয় নি। না হওয়ারই কথা। কালো একটা মেয়েকে কারই বা পছন্দ হবে। সেতো মাশাল্লাহ কত্তো সুন্দর। কেন যে আমাকে বিয়ে করলো। না করলেই পারতো। আমি কি তার কাছে যাবো? নাকি ঘুমিয়ে পড়বো? কি করবো আমি? আল্লাহ তুমি আমাকে কেন কালো বানালে? আজকের দিনটা প্রতিটি মেয়ের কাছে বিশেষ এক রাত। কিন্তু আমার কাছে হয়তো তা অভিশাপ। আমার কপালে সুখ নেই। আছে একরাশ তিক্ততা। হয়তো এই তিক্ততা নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে আজীবন। উনি কি আজ আর ভিতরে আসবেন না?"মৌরি এসব ভাবতে ভাবতেই সাফাত ভিতরে ঢুকে।
আমার চোখে মুখে ভীষণ গাম্ভীর্যতা। রাগ হলে আমার মুখ লাল হয়ে যায়। আজও তার ব্যতিক্রম হয় নি। মৌরিকে মাত্র দু'বার দেখেছি। একবার যখন দেখতে গিয়েছি তখন। আর একবার আজ বিয়ের সময়। এছাড়া তেমন দেখিনি। ইচ্ছা হয় নি দেখার। এরকম কালো মেয়েকে কে দেখতে চাইবে? কেউ না। আমিও চাই না৷ আর ভালো লাগছে না বাইরে। তাই রুমে ঢুকে আলমারি থেকে ট্রাউজার আর টি-শার্ট নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেলাম।
মৌরি সাফাতের এই আচরণ দেখে খুব ব্যথিত হলো। একটা বার ওর দিকে তাকালোও না। কালো হওয়া কি এতোই খারাপ? কালো মানুষেরা কি ভালবাসা পাওয়ার যোগ্যতা রাখে না? আমি তো ইচ্ছা করে কালো হইনি। আল্লাহ তায়ালা আমাকে কালো বানিয়েছেন। এটা কি আমার দোষ? মৌরি এসবই ভাবছিলো। এরমধ্যেই সাফাত বেড়িয়ে আসি।
বাইরে এসে মুখ মুছতে মুছতে মৌরির দিকে একবার তাকালাম। মেয়েটা বঁধু সাজে চুপচাপ মাথা নিচু করে লাল বেনারসি পরে গোলাপের পাপড়ির উপর বসে আছে। আমার অপেক্ষায়। কিন্তু আমার ওকে দেখে কেন জানি রাগ আরো বেড়ে যাচ্ছে। যে মেয়েকে মনে ধরে নি তাকে কীভাবে বউ হিসেবে মানবো! তোয়ালেটা সোফায় ছুড়ে মেরে বেডে গিয়ে বসি। আমার পিছনেই মৌরি বসে আছে। আমি অন্যদিকে ফিরে পা ঝুলিয়ে বসে আছি। ভাবছি কি করবো। ওকে কথা শুনাতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু এখন কিছুই ভালো লাগছে না। তাই বেডে পা তুলে অন্যদিকে ফিরেই শুয়ে পড়ি।
মৌরি সাফাতকে শুয়ে পড়তে দেখে মনে মনে বলছে,"একি উনি শুয়ে পড়লেন! আমার কি হবে? আমি কি এভাবেই বসে থাকবো? আমাকে দেখবে না? আমার সাথে একটু কথা বলবে না? আমি কি করবো এখন?" ও বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে সাফাতের এই আচরণে।
মৌরি কিছু না ভেবেই ওর আঙুল দিয়ে আস্তে করে সাফাতের বাম হাতে একটা গুতো দিয়ে বলে,
~ এই যে শুনুন। আমার সাথে একটু কথা বলুন। কিছু না বলেই শুয়ে পড়লেন যে।
আমি কান দিয়ে মৌরির মিষ্টি কোকিলা কণ্ঠটা শুনলেও জেদ করে চোখ বন্ধ করে শুয়েই আছে। এদিকে মৌরি সাফাতের কোন সাড়া না পেয়ে আবার বলে,
~ আমি জানি আপনি ঘুমান নি। একটু উঠে কথা বলুন। আমাকে দেখুন। আপনার জন্যই সেজেছি। আপনার স্ত্রী তো আমি। আমাকে একটু দেখবেন না?
এবার আমি একলাফে উঠে ঘুরে মৌরির দিকে তাকিয়ে রাগী কণ্ঠে বলে,
- না! দেখবো না আমি তোমাকে। আমার ইচ্ছা নাই তোমাকে দেখার। আমার বাবাকে পটিয়ে আমাকে বিয়ে করেছো। তোমরা সবাই বাটপার। সুন্দর ছেলে পেয়ে আমার বাবাকে মাখন লাগিয়ে তোমার বাবা তাঁর কালো মেয়েটাকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে। যত্তসব বাটপার লোক।
সাফাতের কথাগুলো মৌরির ভিতরটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খান খান করে দিয়েছে। ও এতোক্ষণ ঘোমটার আড়ালেই ছিলো। ও ভেবেছিলো সাফাত হয়তো ওর ঘোমটাটা তুলবে৷ কিন্তু সাফাত তো ওর মনটাকে ভেঙে শেষ করে দিলো। তাও বিয়ের প্রথম রাতেই। মৌরি সাফাতের কথা শোনার পর মুহূর্তেই নিজ থেকে ঘোমটা তুলে অশ্রুসিক্ত নয়নজোড়া নিয়ে সাফাতের তিক্ততা ভরা মুখের দিকে তাকায়। যে চাহনিতে আছে অজস্র কষ্ট আর অপমানিত বোধ।
এই প্রথম আমি মৌরিকে এতোটা কাছ থেকে দেখলাম। চোখে কাজল, বড় বড় পাপড়ি, ডান চোখের পাশে একটা ছোট্ট কালো তিল আছে। নাকটা পারফেক্ট। ঠোঁটদুটো গোলাপের পাপড়ির মতো। খুব মিষ্টি লাগছে। শুধু মুখের রঙটা কালো। আসলে অতিরিক্ত কালো না। মৌরি যে ভারি মেকাপ করেছে তা কিন্তু মোটেও না। মেকাপ বলতে চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক এই অার কিছু না। আমার কাছে তাই ই মনে হলো৷ তবে ও কালো। কোন ফর্সা মেয়ে না৷ যদি ও ফর্সা হতো একদম আমার মনের মতো হতো। শুধুমাত্র কালারটার জন্যই মৌরিকে আমি এখন মেনে নিতে পারছি না। ওর অশ্রুসিক্ত চোখ আমার বিবেককে নাড়া দেয়। কিছুটা বুঝতে পারছি যে বেশী বলে ফেলেছি। তাই আমি নজর নামাই। আর ও বলে উঠে,
~ আপনি এখন অামার স্বামী। আমার উপর আপনার অধিকার আছে। তাই আপনি আমাকে যাতা বলতে পারেন। কিন্তু দয়া করে আমার পরিবারকে কিছু বলবেন না। আপনার বাবা আমাকে পছন্দ করেছে। আমার সাথে কথা বলেছে। আমার বাবা তাকে বারবার জিজ্ঞেস করেছে যে, আমার মেয়ে তো কালো। ওকে এর আগে অনেকেই না করে দিয়েছে। আপনি ভেবে চিন্তে হ্যাঁ বলছেন তো? আপনার বাবার উত্তর হ্যাঁ ই ছিলো। আমার বাবা আমার পরিবার বাটপার না। দয়া করে তাদের কিছু বলবেন না। তাদের কোন দোষ নেই।
- তাদের সত্যিই কোন দোষ নেই। দোষ যতসব আমার কপালের। তোমার মতো কালো মেয়েই আমার কপালে ছিলো। কতো স্বপ্ন ছিল এই রাতটা নিয়ে। সব শেষ। কয়লা ধুইলে যেমন ময়লা যায় না। ঠিক তোমার মতো কালো মেয়ে কখনো ফর্সা হবে না। আমার জীবনটাই শেষ। আমি কখনোই তোমাকে মেনে নিতে পারবো না। এটা কোন সিনেমা না। এটা আমার বাস্তব জীবন। আমি এতো উদার না যে আমি তোমাকে মেনে নিবো আর তোমার অধিকার তোমাকে দিব। কখনো না। আমি তোমার মতো কালো বউ চাই না। আমি এখন ঘুমাবো। আমাকে আর ডাকবা না। আর হ্যাঁ বাবা-মা যেন কিছু না জানে। তুমি তোমার মতো আমি আমার মতো থাকবো। কখনো আমার কাছে আসার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করবে না। কখনো না।
মনের যত্ত ক্ষোভ ছিল সব বের করে মৌরিকে শুনিয়ে আমি অন্যদিকে ফিরে ঘুমিয়ে পড়ি। বেশ হালকা লাগছিলো। কিন্তু রাগটা যায় নি। হয়তো কখনো যাবেও না।
অন্যদিকে মৌরি বাকরুদ্ধ। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে সাফাতের কথা শুনে। বিয়ের প্রথম রাতেই চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরছে। নিঃশব্দে কান্না করতে করতে মৌরি নিজের হাত দুটো তুলে দেখছে ও কতটা কালো। ও মনে মনে বলছে,
~ আজ এই গায়ের রঙ আমাকে আমার অধিকার, সুখ সবকিছু থেকে বঞ্চিত করলো। সত্যিই মানুষেরা সবাই সুন্দরের পূজারী। সুন্দর ফর্সা গায়ের রঙ সবার প্রিয়, সুন্দর একটা মন তাদের কাছে প্রিয় না। হ্যাঁ আমি কালো। কালোই আমার পরিচয়। আমার ভাগ্যে কখনো সুখ নেই এই কালো হওয়ার জন্য। এটাই হয়তো আমার নিয়তি। আল্লাহ আমি মেনে নিলাম তোমার এই নিয়তিকে। দেখি কতদূর যেতে পারি। এ সমাজে আর কতদিন টিকে থাকা যায় আমিও দেখবো।
ওভাবেই বসে অনেকক্ষণ পার করে মৌরি। চোখের জলগুলো শুকিয়ে গিয়েছে। ও আস্তে করে উঠে জামা নিয়ে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। একমাত্র আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য নামাজ সবচেয়ে উত্তম। ও নামাজ শেষে মোনাজাতে অনেক কাঁদে। আল্লাহর কাছে অনেক নালিশ করে। আল্লাহর সাথে মনে মনে অনেক কথা বলে। মনটা যখন কিছুটা হালকা হয় তখন মোনাজাত শেষ করে উঠে দাঁড়ায় ও। জায়নামাজটা পাশে রেখে মৌরি সাফাতের দিকে তাকায়। বেঘোরে ঘুমাচ্ছে ও। মনের অজান্তেই কোন এক অজানা টানে মৌরি সাফাতের কাছে যায়। মানে যেদিকটা ফিরে সাফাত ঘুমাচ্ছিলো। ও সাফাতের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। খুব নিষ্পাপ মনে হচ্ছে। সাফাত দেখতে খুব সুন্দর। ফর্সা টানটান মুখ, বড় বড় সিল্কি চুল, ফিটফাট বডি। খুব আকর্ষনীয় ও। মৌরি সব অপমান ভুলে সাফাতের কাছে এসে বসে ওকে দেখছে। রুমে একটা ছোট ডিম লাইট জ্বলছিলো। সেই আলোতেই মৌরি সাফাতকে দেখছে। বেডে হাত রেখে তার উপর মাথা রেখে ও সাফাতকে দেখছে। নিজের স্বামীকে হয়তো সারাজীবন এভাবেই দেখতে হবে। মৌরি ওর একটা হাত ভাসমান অবস্থায় সাফাতের মুখের পাশে ধরে। সাদা আর কালো। কোন মিল নেই। ও আস্তে করে হাতটা সরিয়ে আনে। আর মনে মনে বলে,
~ আপনি কত্তো সুন্দর। আপনার জীবনটা সত্যিই আমি অন্ধকার করে দিলাম। আজ রাতটায় আমার জায়গায় কোন সুন্দরী অপরূপা হলে আপনি কত্তো খুশী হতেন। আপনার সব খুশী আমার কালোত্ব কেড়ে নিল। আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। আমার কালো কপাল আপনার জীবনের সব সুখ কেড়ে নিল। সব।
মৌরি কাঁদতে কাঁদতে উঠে আস্তে করে সাফাতের পাশে অন্যদিকে ফিরে শুয়ে পড়ে। মাথার বালিশটা সাক্ষী ও কতটা কেঁদেছিলো সেদিন রাতে।
পরদিন সকালে,
দক্ষিণা জানালা দিয়ে ঠান্ডা একটা বাতাস এসে মুখে লাগে। সাথে সাথে ঘুমটা ভেঙে যায়। চোখ মিলে তাকাই। রাতের সব আস্তে আস্তে মনে পড়ে। নিজের কপাল ভেবে নি সব। সবার কপালে সব কিছু থাকে না। সবার সব ইচ্ছা কখনো পূরণ হয় না। আমারও হয়নি। বিয়ের প্রথম রাতে বউটাকে নিজের কাছে পাইনি। হয়তো কখনোই পাওয়া হবে না। কালো বউকে আমি কখনো মেনে নিব না। এসব ভেবে কাত হয়ে শোয়া থেকে অন্যপাশে ফিরি। একি! অন্যপাশে ফিরে আমি তো পুরো থ! কে ও?
চলবে..?
#অপূর্ণ_জীবন
পর্বঃ ০১
সবার ভালো সাড়া চাই। আর কেমন লেগেছে জানাবেন কিন্তু। সাথে থাকবেন সবসময়। ধন্যবাদ।
☞সকলে ১ বার হলেও শেয়ার করুন

No comments:
Post a Comment