আমার রবীন্দ্রনাথ


 

                আমার_রবীন্দ্রনাথ


অনেকে হয়তো ভাবছেন রবীন্দ্রনাথ আবার আমার হল কবে থেকে? আসলে এই "আমার" কথাটার মধ্যে কেমন যেন একটা সুপ্ত অধিকারবোধ থাকে। যাকে খুব কাছের ভেবে আগলে রাখার ইচ্ছে জাগে মনে সেই তো "আমার"। রবিঠাকুর তো আমার. .আপনার.. তার ...সব্বার। কিভাবে রবীন্দ্রনাথকে আমার করে নিয়েছি তাঁর জন্মলগ্নে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে আজ বলবো সেইসমস্ত কিছু কথায়। 

   তখন ক্লাস ওয়ান। সদ্য দিদির হাত ধরে গ্রামের প্রাইমারি স্কুল যাওয়া শুরু করেছি। কবিগুরুকে প্রথম চিনলাম সহজপাঠ বইয়ের মলাটের উপর থাকা এক দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ হিসেবে। আমার শিক্ষক দাদু বলেছিলেন উনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 

 প্রতি শনিবারে আমাদের ছোট্ট স্কুলে নিয়মমাফিক অনুষ্ঠিত হত সাহিত্যসভা।মহাপুরুষদের ছবি রেখে  টগর আর কলকে ফুল দিয়ে সাজানো হতো কাঠের টেবিল তার সামনে দাঁড়িয়ে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বলতাম----

"মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি,

 আজ আমাদের ছুটি ও ভাই আজ আমাদের ছুটি" আবার কোনদিন  " অল্পেতে খুশি হবে দামোদর শেঠ কী?" বা "তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে,

 সবগাছ ছাড়িয়ে 

 উঁকি মারে আকাশে। "

আর পঁচিশে বৈশাখ, মানে কবির জন্মদিনের  দিন তো সকাল থেকে শুরু হতো ভীষণ ব্যস্ততা চলতো হৈ হুল্লোড়। কে কত বেশি ফুল স্কুলে নিয়ে যেতে পারে যেন চলতো তারই প্রতিযোগিতা। ঠাকুরের ছবিতে ফুল মালা দিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের পর শুরু হতো অনুষ্ঠান। "গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজোর" মতো  রবিসৃষ্ট বিভিন্ন সাহিত্যসুধা দিয়ে কবির জন্মদিনের নৈবেদ্য সাজানো হতো । কেউ গান কেউ কবিতা কেউ নাচ এইভাবেই ভীষণ আনন্দে কেটে যেত সকালটা।  গ্রামের ক্লাবের মঞ্চেও সন্ধেবেলায় পালিত হত রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান। গ্রামের সম্মানীয় মুরুব্বি ব্যক্তিরা পাজামা পাঞ্জাবি পড়ে বারবার ক্যা কু করে বিকট শব্দ করা মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখতেন। আমার বাবা কাকুও ছিলেন এই দলে। সেই অনুষ্ঠানে গ্রামের স্কুলকলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়ে ছাড়াও অনেক গুণী কাকা পিসি কাকিমারাও অংশগ্রহণ করতেন সানন্দে। এই সুন্দর অনাড়ম্বর সন্ধ্যেটির জন্য আমরা সারা বছর ধরে অপেক্ষা করতাম। আমাদের একান্নবর্তী মধ্যবিত্ত পরিবার ছিল যথেস্ট সংস্কৃতিমনস্ক। আমার মা রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। কাকিমাও গান গাইতেন..  তবলাও বাজাতেন। এখন আমার দিদি বোনও খুব ভালো গান গায়। আমরা বাবা কাকুদের পিছনে বসে এখানে সেখানে আবৃত্তি করতে..গান গাইতে যেতাম। 

একটু বড় হতেই পাশের গ্রামের উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম।  অনেকটা রাস্তা হেঁটে হেঁটে যেতে হতো। এই বিশেষ দিনটিতে কোন ভোরবেলা থেকে উঠে শাড়ি পড়ে  লটপট করতে করতেই ছুটতাম। কখনো মনে হয়নি কোন কষ্ট হচ্ছে বরং আনন্দে আত্মহারা হয়ে থাকতাম কিছু দিন আগে থেকেই। 

      গল্পের বই পড়ার নেশা ছিল আমার খুব ছোট থেকেই। তখন আমার কাকু ছিলেন আমাদের গ্রামের লাইব্রেরীয়ান।  মনে পড়ে রবি ঠাকুরের "বলাই" ও "পোস্টমাস্টার" এইদুটি আমার খুব প্রিয় গল্প ছিল। স্কুল ছুটি থাকলে ভাত খেয়ে সারা দুপুর শুয়ে শুয়ে গল্প বই পড়া। একটু বড় হতেই মানে প্রাকযৌবন বয়সে  লাইব্রেরি থেকে রবিঠাকুরের বড় গল্প ও বিভিন্ন উপন্যাসের বইগুলো এনে ক্লাসের বইখাতার নীচে রেখে লুকিয়ে পড়তে গিয়ে অনেকবার বাবার কাছে চরম বকা খেয়েছি। কিন্তু এমন এক অদৃশ্য টান ছিল বকাঝকা খেয়েও সে টান মোটেই চলে যেত না বরং আরো জোরালো হত। পরবর্তীতে আমার হোস্টেল জীবনেও রবিকিরণ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখিনি। সেখানেও আমরা সব বান্ধবীরা মিলে নিজেদের উদ্যোগে পালন করতাম রবীন্দ্রজয়ন্তী। স্টেটবাসে করে বাড়ি যাওয়া আসার পথে গল্পের বইগুলিই আমার সঙ্গী হতো প্রতিবার। ভাগ্যিস স্মার্ট ফোন ছিল না তখন। আমি মনে করি বাংলার এমন কোন মেয়ে নেই যে নিজেকে অন্তত একবার রবিঠাকুরের গল্প উপন্যাসের নায়িকা বলে কল্পনা করেনি বা নিজের সঙ্গে তার মিল খুঁজে পায়নি। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব পছন্দের নারী চরিত্রের স্থানে ভাবতে বেশ লাগতো ...এখনো লাগে। এখন বয়স যত বাড়ছে ততই যেন বেশি করে আঁকড়ে ধরছি এই প্রানের ঠাকুরকে। এখন ছেলেকে তাঁর শিশুকাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো পড়ানোর সময় আমার ছোটবেলার খুব প্রিয় স্মৃতিগুলো যত্নকরে সাজাই। কবিগুরুর বিভিন্ন জীবনদর্শনের , জীবনবোধের রচনাগুলো আমার অস্থির মনকে শান্ত করে সবসময়ই।  দীর্ঘদিন ধরে আগলেরাখা কোনো স্বপ্ন যখন চোখ ভিজিয়ে টুপটুপ করে চুঁইয়ে পড়ে তখন নিজের মনকে আজ আশ্বস্ত করে বলতে পারি

"মনেরে আজ কহ যে, 

ভালো মন্দ যাহাই আসুক সত্যেরে লও সহজে।" 

        মানুষ প্রেমের আনন্দে, বিচ্ছেদের ব্যাথায়, প্রাপ্তির সুখে, অপ্রাপ্তির যন্ত্রনায়, জীবনের সমস্ত অনুকূল বা প্রতিকূল অন্ধকার পরিস্থিতিতে যাঁর কিরণে আলোকিত হতে চায় , যার কলমের পরশে মনে শান্তির সন্ধান পায় তিনিই তো রবীন্দ্রনাথ। 

  আজ খুব প্রিয় একটি ভক্তিগীতির  কয়েকটি লাইন দিয়ে আমার প্রানের ঠাকুরকে আমার অন্তরের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করি....

""যে তৃষা জাগিলে তোমারে হারাবো 

 সে তৃষা আমার জাগায়ো না

যে ভালোবাসায় তোমারে ভুলিবো

সে ভালোবাসায় ভুলায়ও না।"

No comments:

Post a Comment